ঢাকা সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

লালদিয়া টার্মিনাল হবে বৈশ্বিক লজিস্টিক হাব

লালদিয়া টার্মিনাল হবে বৈশ্বিক লজিস্টিক হাব

চট্টগ্রামের লালদিয়ার চরে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল গতকাল রোববার| এদিন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, 'আজ নতুন অধ্যায়| কারণ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও টার্মিনাল হ্যান্ডলিংয়ের নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছি| পিপিপিতে অনেক বড় বিনিয়োগ| 'প্রতি বছর ৮ লাখ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হব| সঙ্গে অনেক আধুনিক সুবিধা থাকবে| বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা প্রতিষ্ঠার সূচনা আজ হতে চলেছে|'

বিদেশি বিনিয়োগে হতে যাওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম টার্মিনালটি সম্পর্কে তিনি বলেন, 'চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক করার এ অগ্রযাত্রা শুরু হচ্ছে| আরো অনেকের আগ্রহ আছে| দেশের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা চলছে|

'লালদিয়া আধুনিক টার্মিনাল কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, সেটার পথও আমাদের দেখাবে| এটি বাস্তবায়নে যত সহযোগিতা প্রয়োজন তা আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে করা হবে|' অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'চট্টগ্রামবাসীর হৃদয় হল বন্দর| এখানে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্দর ঘিরেই হয়| আমাদের আছে একটি নির্বাচিত সরকার|

'২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য আছে সরকারের; হয়ত কিছুটা উচ্চাভিলাষী| কিন্তু দীর্ঘামেয়াদে আমাদের উচ্চাভিলাষী হতেই হবে|'

অর্থনীতি পরিচালিত হয় বেসরকারি খাতের মাধ্যমে মন্তব্য করে তিনি বলেন, 'সরকারের কাজ তাদের সহযোগিতা করা| আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সবচেয়ে ভালো ব্যবসা নীতি, বিনিয়োগ নীতি ও লজিস্টিক সাপোর্ট থাকতে হবে| 'চট্টগ্রামকে লজিস্টিক্যাল হাবে পরিণত করা আমাদের লক্ষ্য; শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এই অঞ্চলের জন্য| তাই চট্টগ্রাম বন্দরের সম্ভাবনাকে পুরোদমে কাজে লাগাতে হবে' অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আশা করি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই টার্মিনালের কাজ শেষ হবে| আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সব রকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি| বিশ্বের জন্য আমরা দ্বার উন্মুক্ত করতে চাই| শুধু লজিস্টিক হাব হিসেবে নয়, সবরকম বিনিয়োগের জন্য|

'এটার সঙ্গে আরও কয়টি পোর্ট করতে যাচ্ছি| চট্টগ্রামে আরও কয়টি ইকোনমিক জোন হবে| চট্টগ্রামের মানুষের যে প্রত্যাশা, বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে| 'বাণিজ্যিক রাজধানী কেউ করে না, বাণিজ্যিক রাজধানী হয়| এসমস্ত কাজের মাধ্যমে যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, সেটাই হবে বাণিজ্যিক রাজধানী|' কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণের জন্য অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় গত ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি সই করে ডেনমার্কের মেয়াস্কর্ গ্রুপের কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস| চুক্তির শর্ত অনুসারে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এপিএম টার্মিনালসকে প্রকল্পের জন্য জমি হস্তান্তর করে|

নির্মাণ সময় ৩ বছর ধরে হওয়া কনসেশন চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনাল চালু হওয়ার পর তা ৩০ বছর পরিচালনা করবে| আর চুক্তির শর্ত পূরণ ও পালন করলে এই মেয়াদ আরো ১৫ বছর বাড়বে| সব মিলে টার্মিনালটি তাদের হাতে থাকতে পারে ৪৮ বছর| বাংলাদেশে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, 'ডেনমার্ক বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার| বাংলাদেশের অগ্রগতিতে একসঙ্গে কাজ করতে আমরা সবসময় আগ্রহী| 'লালদিয়া টার্মিনালের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই বার্তা দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত|' এপিএম টার্মিনালসের সিইও রমেশ ডেভিড বলেন, 'এটি অনেক প্রথমের একটি প্রকল্প| প্রথম পিপিপি, প্রথম সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রথম গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল| এখানে আমরা নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করব|' চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, 'দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯৫ শতাংশ হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে| বিশ্বব্যাপী বন্দর ব্যবস্থাপনা দ্রুত বদলে যাচ্ছে| আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ না করলে আমরা পিছিয়ে যাব| বন্দর ব্যবহারকারীদের সময়োপযোগী সেবা দিতে আমাদের আধুনিক ও গ্রিন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হচ্ছে| 'এপিএম টার্মিনালস আন্তর্জাতিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত অভিজ্ঞ| তিন বছরের মধ্যে আপনারা লালদিয়াতে এর প্রতিফলন দেখবেন| এটিই ২৪/৭ সচল প্রথম টার্মিনাল হতে চলেছে| আমাদের বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ কনটেইনার ধারণ ক্ষমতার জাহাজ ভিড়বে লালদিয়া টার্মিনালে|' অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া, এপিএম টার্মিনালসের গ্লোবাল হেড অব অপারেশনস জ্যাক ক্রেগ| নতুন টার্মিনালের নির্মাণ কাজ শেষ হলে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানিতে থাকা অংশের গভীরতা) এবং ৬ হাজার টিইইউএস (কুড়ি ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারকে একক ধরে) ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে সেখানে| বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরা ই-টার্মিনাল নির্মাণকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন| এতে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত ও কম খরচে পণ্য খালাস এবং বড় আকারের কন্টেইনার জাহাজ চলাচলের পথ সুগম হবে বলে মনে করছেন তারা|

নতুন টার্মিনাল কেমন হবে : চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান টার্মিনালগুলো থেকে ৯ কিলোমিটার ভাটিতে (মোহনার কাছে) কর্ণফুলীর নদীর গুপ্তবাঁকের আগেই লালদিয়ার চরের অবস্থান|

চরের পর গুপ্তবাঁক পেরিয়ে আছে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)| টার্মিনালটি পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)| এরপর আরও উজানে চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)| সাগর মোহনা থেকে কর্ণফলী নদীতে প্রবেশের পর নদীর বাক পেরিয়ে এসব টার্মিনালে জাহাজ ভেড়াতে হয়| সবগুলো টার্মিনালের মধ্যে মোহনার সবচেয়ে কাছে অবস্থান নির্মাণাধীন লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের| নদীতে কোনো বাঁক পেরনো ছাড়াই সবচেয়ে কম সময়ে, দ্রুত গতিতে এবং বড় আকারের জাহাজ ভিড়তে পারবে এখানে| লালদিয়া টার্মিনালের মূল টার্মিনাল অংশ হবে ৩২ একর জুড়ে| এরপর ৭ দশমিক ১৫ একারের কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একরের ট্রাক পার্কিং ও প্রি গেট সুবিধা মিলিয়ে পুরো টার্মিনালটি হবে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে|

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত